১৯২৭ সালের ১৩ জুন (মতান্তরে ১৬ জুন) ভরতপুর থানার (বর্তমানে সালার থানা) বাবলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আবুল বরকত সাহেব।
তাঁর বাবার নাম ছিল সামসুজ্জোহা এবং মা হাসিনা বিবি।
জাহাঙ্গীর এর আমলে উত্তর ভারত থেকে কিছু পণ্ডিত মানুষ আসেন কান্দি, সালার, তালিবপুর ও কাগ্রাম এলাকায়। ওনাদের ফার্সি ও আরবী ভাষায় পাণ্ডিত্যের কারণে বিনামূল্যে করমুক্ত জমিও দান হিসেবে পান। ওনাদের কেউ কেউ নবাব দের অনুগ্রহ লাভ করেন। দিল্লীর দরবার থেকে আগত ওই সব লোকজনরা ধীরে ধীরে পুরোপুরি বাংলার জল, মাটি , যাওয়ার সাথে মিশে পুরো দস্তুর বাঙালি হয়ে যান। পারিবারিক দিক থেকে সামসুজ্জোহার পরিবার ছিল এনাদেরই বংশধর। এনারা বেশ লম্বা চওড়া চেহারায় এবং উন্নত স্বাস্থ্যের অধিকারী ছিলেন। আবুল বরকত এর উচ্চতা ছিল আফগান পাঠানদের মতো। তাঁর ডাক নাম ছিল আবাই। শিশু বয়স থেকেই মেধাবী ছিলেন আবুল বরকত।বাবলা গ্রামে প্রাথমিক বিদ্যালয় এর পড়াশোনা শেষ করার পর তিনি ১৯৩৭ সালে তালিবপুর হাইস্কুলে ভরতি হন। এই স্কুলের জন্যে জমিদান করেছিলেন আমাদের পূর্বপুরুষদের একজন, নাম ফুল মিয়া।
১৯৪৫ সালে তালিবপুর স্কুল থেকে সসম্মানে মাট্রিক পাশ করেন। স্কুলের পাঠ শেষ করলে তাঁকে ১৯৪৫ সালে বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজে ভর্তি করা হয়। উনি থাকতেন বহরমপুরের #রাজা_মিয়া মসজিদ এর ছাত্রাবাসে।
এবার আসি আসল গল্পে। কৃষ্ণনাথ কলেজ থেকে ১৯৪৭ সালে কৃতিত্বের সাথে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেন। ওই বছর ভারত ভাগের পর ওনাদের মামার পরিবার ঢাকাতে চলে যান। ওনার মামার নাম আব্দুল মালেক যিনি ঢাকার জল উন্নয়ন বোর্ডের এ্যাসিস্ট্যান্ট একাউন্টস অফিসার হিসেবে কাজ করতেন এবং থাকতেন ঢাকার পল্টনে বিষ্ণু প্রিয়া ভবনে। সেইসময় কলকাতা বিশ্ব বিদ্যালয়ে পড়ার খরচ খুব বেশি ছিল তাই স্থির হয় আবুল বরকত ঢাকাতে তাঁর মামার বাড়িতে থেকে পড়াশোনা করবেন। ১৯৪৮ সালে চলে যান পল্টন এ মামার বাড়িতে। তাঁর বাবা মা দুজনেই থেকে যান মুর্শিদাবাদে। ১৯৫১ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে দ্বিতীয় শ্রেণিতে চতুর্থ স্থান অধিকার করে গ্র্যাজুয়েশন ডিগ্রি লাভ করেন। ওই সময় তিনি এম.এ ক্লাসে ভরতি হন। কিন্তু তারপরেই জড়িয়ে পড়েন ভাষা আন্দোলনে। উনি ছিলেন অনেক লম্বা তাই ওনার উপর দায়িত্ব ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে পতাকা টাঙানোর। এতে উনি বেশ পারদর্শী ছিলেন। বিক্ষোভের রেশ চরমে ওঠে যখন ১৯৫২ সালের ৩০ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মঘটের ডাক দেয় ছাত্ররা। ছাত্রদের বিক্ষোভ দমন করতে ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে উর্দুভাষী পাকিস্থানি সরকার ১৪৪ ধারা বহাল রাখে। ছেলেরা ফুঁসে ওঠে এই ১৪৪ ধারার বিরুদ্ধে। সাধারণ মানুষও এগিয়ে এসে হরতালের যোগ দেয়। ওই দিন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণ খন্ড যুদ্ধ বাঁধে পুলিশের সাথে। সামনের সারিতে ছিল দীর্ঘদেহী আবুল বরকত। পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করতে এলোপাথাড়ি গুলি ছুড়তে থাকে। সামনের সারিতে থাকা আবুল বরকত সাহেবের বুকে হঠাৎ গুলি লাগে। লুটিয়ে পড়েন ওখানে। তারপর তাঁকে সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালের ইমারজেন্সি বিভাগে নিয়ে যাওয়া হয়, কিন্তু রক্তক্ষরণের ফলে রাত আটটায় হাসপাতালের বেডে তাঁর মৃত্যু হয়। এভাবেই ভাষা আন্দোলনের প্রথম শহীদ আবুল বরকত উস্কে দিলেন স্ফুলিঙ্গ। ওই দিন 144 ধারা ছিল কিন্তু মৃত্যু সংবাদ কানে যেতেই আশেপাশের লোকজন ওই আইন অমান্য করে জড়ো হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে। ভয় পেয়ে যায় সরকার।ৎসেদিন মারা যায় অনেক লোক কিন্তু পুলিশ মর্গ ও হাসপাতাল থেকে সরিয়ে ফেলে অনেক লাশ। যাতে বাইরে ছড়িয়ে না যায় এর খবর। সৌভাগ্য ক্রমে আবুল বরকত সাহেবের মামা আব্দুল মালেক এবং আরেক আত্মীয় আবুল কাশেম সরকারের উচ্চপর্যায়ের অফিসার ছিলেন। মূলত তাদের দুই জনের কর্মচেষ্টার ফলে পুলিশের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় বরকত সাহেবের লাশ। এভাবেই শেষ হয় একটি অধ্যায় এর।
যারা ভাষা আন্দোলন মানে ভাবেন কিছু বাংলাদেশির দ্বারা উর্দুভাষী সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন, এটা ভুল ধারণা। বাংলাদেশ এর অনেকেই কৃতিত্ব বা পেটেন্ট নিয়ে বসে আছেন যে, এটা নাকি শুধুমাত্র বাংলাদেশীদের দ্বারা বাংলা ভাষার জন্য আন্দোলন। কিন্তু এখন থেকে আমরা পশ্চিমবঙ্গ তথা মুর্শিদাবাদবাসী গর্বের সঙ্গে বলবো ভাষা আন্দোলনে আমাদের ছেলে আবুল বরকতের কথা, ওনার বীরত্বের কথা, আত্ম বলিদানের কথা। কেন জানিনা সবাই ভুলিয়ে দিতে চায় এই গৌরবময় গাথার কথা। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিবিদ রাও এব্যাপারে উদাসীন। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের লগ্নে সবাইকে জানিয়ে দিন এই গৌরব গাথার কথা ।
সূত্র :- দা মসনদ ওফ মুর্শিদাবাদ ও আরো কিছু গুরুত্বপূর্ন রেফারেন্স বই এবং বিশেষ সহযোগিতায় মুর্শিদাবাদের উইকিপিডিয়া Tanvir Islam ...
_
সোহেল রানা আলম
No comments:
Post a Comment